বিএনপির বিক্ষোভ সমাবেশে হামলা, দেড় শতাধিক নেতাকর্মী আহত

গুরুতর অসুস্থ বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং তার সুচিকিৎসার দাবিতে ঢাকাসহ সারাদেশে সমাবেশ করেছে দলটি। তবে রাজধানী ঢাকা, খুলনা, নাটোরসহ কয়েকটি স্থানে পুলিশের হামলায় দেড় শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন বিএনপি নেতারা। সরিষাবাড়ীতে বিএনপির ৬০ নেতাকর্মীর নামে মামলা দিয়েছে পুলিশ। নরসিংদীতে বিএনপি কার্যালয়ে শতাধিক নেতাকর্মীকে অবরুদ্ধ করে রাখে পুলিশ।
গতকাল সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি আয়োজিত সমাবেশে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে আন্দোলন ছাড়া আর কোনো পথ নেই। আমাদের সামনে একটাই পথ- আন্দোলন, আন্দোলন আর আন্দোলন। আন্দোলনকে আরও বেগবান করতে হবে।’ এ সময় আজ মঙ্গলবার সারাদেশে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি প্রদান কর্মসূচি ঘোষণা করে মির্জা ফখরুল বলেন, এতেও তার মুক্তি না হলে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
এক ঘণ্টার এ কর্মসূচি ঘিরে সকাল থেকেই নেতাকর্মীরা জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে জড়ো হতে থাকেন। সমাবেশে নেতাকর্মীদের ব্যাপক উপস্থিতিতে যাত্রীবাহী বাসসহ যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘একটা কথা মনে
রাখতে হবে- হঠকারিতা করবেন না। অতীতে হঠকারিতার জন্য আমাদের অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি, আমরা শান্তিপূর্ণভাবে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন করে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করব।’
বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘এই সরকার সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। তারা মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। দ্রব্যমূল্য আকাশচুম্বী, ন্যায়বিচার নেই, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সব সেক্টর দলীয়করণ করা হয়েছে; মানুষের বাক-স্বাধীনতা নেই, ভোটাধিকার নেই। এ অবস্থায় অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের আহ্বান জানাচ্ছি- আসুন, একসঙ্গে গণতন্ত্রের নেত্রী খালেদা জিয়াকে মুক্ত করি, গণতন্ত্রকে মুক্ত করি এবং আগামী দিনে একটা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করি।’ সমাবেশে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও নজরুল ইসলাম খানও বক্তৃতা করেন।
এদিকে, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিএনপি আয়োজিত সমাবেশ শেষে ছাত্রদল নেতাকর্মীরা মিছিল বের করলে তাতে পুলিশ লাঠিচার্জ করে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল বলেন, সমাবেশ শেষে মিছিল নিয়ে নয়াপল্টন বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের উদ্দেশে রওনা হই। মিছিল কাকরাইল মসজিদ হয়ে রাজমনি হোটেলের সামনে পৌঁছালে পুলিশ সামনে ও পেছন থেকে অতর্কিতে হামলা চালায়। এতে বিভিন্ন ইউনিটের অর্ধশত নেতাকর্মী আহত হন। এর মধ্যে কবি নজরুল কলেজের ছাত্রনেতা হাবিবুর রহমান হিমেল গুরুতর আহত হয়েছেন।
খুলনায় পুলিশের লাঠিচার্জে মঞ্জুসহ আহত ৫০ :পুলিশের বাধা ও লাঠিচার্জে পণ্ড হয়ে গেছে খুলনায় বিএনপির সমাবেশ। এ সময় দু’পক্ষের ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও পুলিশের বেপরোয়া লাঠিচার্জে অন্তত ৫০ নেতাকর্মী আহত হন। ঘটনাস্থল থেকে পাঁচজনকে আটক করেছে পুলিশ। এ সময় পাঁচ সাংবাদিকও আহত হন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও নেতাকর্মীরা জানান, সকাল ১১টায় দলীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ আহ্বান করে খুলনা মহানগর ও জেলা বিএনপি। সমাবেশ শুরুর আগে থেকেই দলীয় কার্যালয় ঘিরে রাখে পুলিশ। সমাবেশ মঞ্চও নিয়ন্ত্রণে নেয় তারা। এ সময় নেতাকর্মীরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিলেন।
দুপুর ১২টার দিকে নগর বিএনপি সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু সমাবেশস্থলে এসে সমাবেশ শুরুর চেষ্টা করেন। পুলিশ তাতে বাধা দেয় এবং মাইক কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা চালায়। বিএনপির সিনিয়র নেতারা পুলিশের সঙ্গে বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। এ সময় নেতাকর্মীরা একজোট হয়ে স্লোগান দিতে শুরু করলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। বিএনপি নেতাকর্মীরা কিছুটা দূরে গিয়ে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়া শুরু করে। পুলিশও পাল্টা ইট ও টিয়ার গ্যাসের শেল ছোড়ে।
পুলিশের পিটুনিতে বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও নগর সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু, সাবেক সিটি মেয়র মনিরুজ্জামান মনি, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমির এজাজ খান, নগর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক তারিকুল ইসলাম, সহসভাপতি শেখ মুশাররফ হোসেন, দপ্তর সম্পাদক শামসুজ্জামান চঞ্চলসহ অন্তত ৪৫ জন আহত হন।
নাটোরে হামলায় আহত ২০ :নাটোরে বিএনপির গণঅনশন কর্মসূচিতে বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। এ সময় পুলিশ, সাংবাদিকসহ ২০ জন আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কয়েক রাউন্ড টিয়ার গ্যাসের শেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। বিএনপির তিন কর্মীকে আটক করেছে পুলিশ।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, নাটোর শহরের আলাইপুরে বিএনপির দলীয় কার্যালয়ের সামনে দলের নেতাকর্মীরা বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা রুহুল কুদ্দুস দুলুর স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন ছবির নেতৃত্বে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিলটি কিছুদূর যাওয়ার পরই পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় দলের নেতাকর্মীদের শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করতে বললে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে পুলিশের ওপর চড়াও হয়। পুলিশ লাঠিচার্জ করলে মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এ সময় সাবিনা ইয়াসমিনসহ বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হন। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে চার গণমাধ্যমকর্মীও আহত হন। আক্রান্ত হন নাটোর সদর থানার ওসি মুনছুর রহমানও।
নরসিংদীতে বিএনপির শতাধিক নেতাকর্মী অবরুদ্ধ :নরসিংদী জেলা বিএনপির কার্যালয়ে সমাবেশ চলাকালে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব, জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক এমপি খায়রুল কবীর খোকনসহ শতাধিক নেতাকর্মীকে অবরুদ্ধ করে রাখে পুলিশ। পরে খায়রুল কবীর খোকন ছাড়া পেয়ে ঢাকায় চলে যান। তবে অন্যরা রাত ১১টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত অবরুদ্ধ ছিলেন।
বিএনপি নেতারা বলেন, তাদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ থেকে পুলিশ সাত কর্মীকে আটক করেছে। তবে নরসিংদীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) সাহেব আলী পাঠান জানান, নিরাপত্তার স্বার্থে কার্যালয়ের সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। কাউকে গ্রেপ্তার করা এবং অবরুদ্ধ করে রাখা হয়নি।
সরিষাবাড়ীতে ৬০ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা :নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে বিএনপির ৬০ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা এবং দু’জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তারা হলেন- পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম ও বিএনপি সমর্থক সুলতান মিয়া।
জানা গেছে, রোববার সন্ধ্যায় আরামনগর বাজার বিএনপির দলীয় কার্যালয়ে পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের উদ্যোগে খালেদা জিয়ার রোগমুক্তির দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এ অনুষ্ঠান চলাকালে অতর্কিতে একদল পুলিশ এসে হামলা চালায়। এ সময় অনুষ্ঠানের নেতাকর্মীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যান। এতে দোয়া অনুষ্ঠান পণ্ড হয়ে যায়। পরে পুলিশ বিএনপির দলীয় কার্যালয় তছনছ করে। এ সময় অনুষ্ঠানের বেশ কিছু চেয়ার, সাউন্ড সিস্টেম ও নম্বরবিহীন ছয়টি মোটরসাইকেল নছিমনে তুলে নিয়ে আসে থানায়। পুলিশ পাঁচটি তাজা ককটেল উদ্ধারের দাবি করেছে।
চট্টগ্রামে নেতাকর্মীদের ভিড়তে দেয়নি পুলিশ :বিকেলে নগরীর কাজীর দেউড়িসংলগ্ন নাসিমন ভবন দলীয় কার্যালয় চত্বরে সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সমাবেশকে ঘিরে উত্তেজনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। সমাবেশে মিছিল নিয়ে যোগ দিতে বিএনপি নেতাকর্মীরা দলীয় কার্যালয়ের আশপাশে জড়ো হওয়ার চেষ্টা করলেও পুলিশ তাদের সে সুযোগ দেয়নি। যেখানেই বিএনপি নেতাকর্মীরা জড়ো হওয়ার চেষ্টা করেছে, সেখানেই ধাওয়া দিয়ে সরিয়ে দেয় পুলিশ। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিএনপি নেতারা। বিএনপির কর্মসূচি ঘিরে কাজীর দেউড়ি এলাকায় বিএনপি কার্যালয়ের আশপাশে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ছিল।
নারায়ণগঞ্জে বিক্ষোভ সমাবেশ :নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সামনে বিএনপির সমাবেশে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরুল ইসলাম রবির সঞ্চালনায় সমাবেশের একমাত্র বক্তা ছিলেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার।
বিক্ষোভ সমাবেশে তৈমূর আলম বলেন, এমন একদিন আসবে, যেদিন আইনমন্ত্রীও আদালতের বারান্দায় ঘুরবেন, আপনারও তখন দেশের বাইরে চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। তখন আমরা আপনাদের মতো কঠোর হবো না।
ফুলগাজীতে খালেদা জিয়ার বাড়ির সামনে সমাবেশ : ফুলগাজী উপজেলার সদর ইউনিয়নের দক্ষিণ শ্রীপুরে খালেদা জিয়ার বাড়ির সামনে বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদল ও অঙ্গসংগঠনের উদ্যোগে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে। উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সচিব আবুল হোসেনের পরিচালনায় সমাবেশে বক্তব্য দেন ফুলগাজী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফখরুল আলম স্বপন, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক গোলাম রসুল মজুমদার গোলাপ, যুগ্ম আহ্বায়ক সিরাজুল ইসলাম মন্টু, আক্তারুজ্জামান আজিম, শহিদুল ইসলাম, উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক কামাল হোসেন, যুগ্ম আহ্বায়ক ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া, নুরুল হুদা শাহীন প্রমুখ।
এদিকে, পটুয়াখালীতে পুলিশের বাধায় বিএনপির সমাবেশ কর্মসূচি পণ্ড হয়ে গেছে। এ সময় কর্মসূচির ব্যানার নিয়ে পুলিশের সঙ্গে বিএনপির নেতাকর্মীদের টানাহ্যাঁচড়ার ঘটনাও ঘটে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ সমাবেশ করার খবর পাওয়া গেছে।-সমকাল