অর্থ পাচারে সন্দেহভাজন ৬৯ নাম হাইকোর্টে

বিশ্বব্যাপী আলোচিত পানামা ও প্যারাডাইস পেপার্সসহ বিভিন্ন মাধ্যমে নাম আসা সন্দেহভাজন বাংলাদেশি অর্থ পাচারকারীদের তালিকা হাইকোর্টে দাখিল করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট(বিএফআইইউ)।
তালিকায় ৬৯ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম তুলে ধরা হয়েছে।
বুধবার ১৪ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনসহ সংশ্নিষ্ট তথ্যাদি হাইকোর্টে এফিডেভিট আকারে দাখিল করে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়।
বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে আগামী রোববার এ বিষয়টি শুনানির জন্য কার্যতালিকায় আসবে।
এর আগে গত বছরের ৫ ডিসেম্বর অর্থ পাচারে সন্দেহভাজন ১৪টি প্রতিষ্ঠান ও ২৯ ব্যক্তির তালিকা হাইকোর্টে দাখিল করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
বিএফআইইউর প্রতিবেদনটি গতকাল হাইকোর্টে দাখিল করেন রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ কে এম আমিন উদ্দিন মানিক। তিনি বলেন, হাইকোর্টের আদেশ অনুসারে বিএফআইইউ গত ২৪ জানুয়ারি সন্ধ্যায় অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে একটি তালিকা অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে জমা দেয়। সেটি যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বুধবার হাইকোর্টে দাখিল করা হয়ে।
রোববার বিষয়টি শুনানির জন্য কার্যতালিকায় আসবে।
প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, বিএফআইইউ হাইকোর্টের আদেশ অনুসারে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি অর্থ পাচারকারীদের বিষয়ে অনুসন্ধান করেছে। তারা সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে চিঠি দিয়েছিল। সেখান থেকে অর্থ পাচারকারী অনেকের ব্যাংকিং লেনদেনের তথ্য-উপাত্ত পেয়েছে। সেসব তথ্য-উপাত্ত এবং পানামা ও প্যারাডাইস পেপার্সসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে যেসব অর্থ পাচারকারীর নাম প্রকাশ হয়েছে, তাদের তথ্য-উপাত্তসহ একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। এখন এ বিষয়ে হাইকোর্ট পরবর্তী আদেশ দেবেন।
বিএফআইইউ এবং দুদকের প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, পানামা পেপার্সে নাম আসা ৪৩ জন ও প্যারাডাইস পেপার্সে আসা ২৬ জনসহ বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া ব্যক্তির নাম, ঠিকানা ও আংশিক পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে।
দুদক সূত্র জানায়, গত ডিসেম্বরে হাইকোর্টে দাখিল করা অর্থ পাচারকারীদের বিষয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। দুদকের মুখ্য কৌঁসুলি ও জ্যেষ্ঠ আইনজাবী মোহাম্মদ খুরশীদ আলম খান সমকালকে বলেন, নতুন কোনো তথ্য-উপাত্ত এবং নাম এলে তা হাইকোর্টে দাখিল করা হবে।
তালিকা করা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে কিনা- এমন প্রশ্নে দুদকের আইনজীবী বলেন, কারও বিরুদ্ধেই অভিযোগ প্রমাণ হয়নি। তদন্ত চলছে। আদালতেই বিষয়টি নিষ্পত্তি হবে।
অর্থ পাচারকারীদের টাকা দেশে ফেরত আনার বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে খুরশীদ আলম খান বলেন, যে দেশে টাকা পাচার করা হয়েছে, সেই দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ছাড়া পাচার হওয়া টাকা ফিরিয়ে আনা এক প্রকার অসম্ভব। তবে এ বিষয়ে সরকারের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
কর ফাঁকি দিয়ে নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড় গড়া, আইন অমান্য করে দেশের টাকা বিদেশে পাচার ও অবৈধ আয়ে বৈধ ক্ষমতার মালিক হওয়া নিয়ে কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশে নানা গুঞ্জন রয়েছে। এরই মধ্যে ২০১৬ সালের এপ্রিলে পানামা পেপার্স নামে দুর্নীতির সংবাদ আসে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে, যেখানে বিশ্বের সাবেক ও বর্তমান শতাধিক রাষ্ট্রনায়ক ও রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, খেলোয়াড়, অভিনেতা, শিল্পী অনেকের নাম ছিল। ২০১৭ সালের ৫ নভেম্বর প্রকাশ হয় একই ধরনের আরেকটি তালিকা, যা পরিচিতি পায় প্যারাডাইস পেপার্স নামে। এখনও এই পেপারে থাকা নানা নাম প্রকাশ হচ্ছে। এ দুই জায়গায় বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম আসে।
সন্দেহভাজনদের তালিকা :বিএফআইইউর প্রতিবেদনে পানামা পেপার্সের ভিত্তিতে যেসব বাংলাদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, সেগুলো হচ্ছে- বেগম নিলুফার কাজী, কাজী জাফর উল্লাহ, কাজী রায়হান জাফর, ক্যাপ্টেন সোহাইল হোসাইন (ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপ বিল্ডার্স), ইফতেখারুল আলম (স্পার্ক লিমিটেড ও অমনিকেম), মো. আমিনুল হক (বাংলা ট্র্যাক লিমিটেড), নাজিম আসাদুল হক (বাংলা ট্র্যাক লিমিটেড), তারিক ইকরামুল হক (বাংলা ট্র্যাক লিমিটেড), এএসএম মহিউদ্দিন মোনেম (আবদুল মোনেম লিমিটেড), আসমা মোনেম (আবদুল মোনেম লিমিটেড), ড. এ এম এম খান (সাবেক সভাপতি, বিএপিআই), আজমত মঈন (মমিন টি), দিলীপ কুমার মোদী (সিপ সিজন ফুড অ্যান্ড বেভারেজস লিমিটেড), শরীফ জহির (অনন্ত গ্রুপ), মার্কেন্টাইল করপোরেশনের আজীজ খান, আঞ্জুমান আজীজ খান, আয়েশা আজীজ খান, জায়েফ উমায়েদ খান ও ফয়সাল করিম খান।
তালিকায় থাকা আরও ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান হচ্ছে- ড. সৈয়দ সিরাজুল হক (সি পার্ল), ইউনাইটেড গ্রুপ অব কোম্পানির হাসান মাহমুদ রাজা, খন্দকার মঈনুল আহসান শামীম, আহমেদ ইসমাইল হোসেন ও আখতার মাহমুদ, মাসকট গ্রুব অব কোম্পানির এফএফ জোবায়দুল হক, সেতু করপোরেশনের মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী ও উম্মে রাব্বানা, বিবিটিএলের ক্যাপ্টেন এম এ জাইল/জলিল, এফএম জোয়দুল হক, সালমা হক, খাজা শাহাদাৎ উল্লাহ, মীর্জা এম ইয়াহিয়া, সৈয়দা সামিনা মীর্জা, মো. আমিনুল হক, মো. জাহিদুল ইসলাম, মোহাম্মদ শহীদ/শাহেদ মাসুদ, মোহাম্মদ ফয়সাল করিম, নজরুল ইসলাম, সৈয়দ সিরাজুল হক ও জুলফিকার হায়দার।
প্যারাডাইস পেপার্সে নাম আসা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান হচ্ছে- আবদুল আউয়াল মিন্টু (মাল্টিমোড লিমিটেড), তার স্ত্রী ফাতেমা নাসরিন আউয়াল এবং তিন সন্তান মো. তাবিথ আউয়াল, মোহাম্মদ তাফসির আউয়াল ও মো. তাজওয়ার আউয়াল, মেঘনাঘাট পাওয়ার লিমিটেডের ফয়সাল চৌধুরী, মোঘল ওয়াই ফরিদা, শহিদ উল্লাহ, সামির আহমেদ, সেভেন সিজ অ্যাসেটস লিমিটেড, সোয়েন ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, ব্রামার অ্যান্ড পার্টনার্স অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট বাংলাদেশ লিমিটেড, ইউনোকল বাংলাদেশ লিমিটেড, ইউনোকল বাংলাদেশ এপপ্লোরেশন লিমিটেড, ইউনোকল শাহবাজপুর পাওয়ার লিমিটেড, এনএফএম এনার্জি (সিঙ্গাপুর) পিটিই লিমিটেড, ইউনোকল বাংলাদেশ ব্লক সেভেন লিমিটেড, ইউনোকল শাহবাজপুর লিমিটেড, ইউনোকল বাংলাদেশ ব্লক ফাইভ লিমিটেড, ইউনোকল বাংলাদেশ ব্লক টেন লিমিটেড, বারলিংটন সিসোর্সেস বাংলাদেশ লিমিটেড, ইউনোকল বাংলাদেশ ব্লক থারটিন অ্যান্ড ফরটিন লিমিটেড, ইউনোকল বাংলাদেশ ব্লক টুয়েলভ লিমিটেড, ফ্রন্টিয়ার বাংলাদেশ (বারমুডা) লিমিটেড এবং টেরা বাংলাদেশ ফান্ড লিমিটেড।–সমকাল
এবিসিবি/এমআই