চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে বাংলাদেশের শিক্ষানীতি

মোহাম্মদ ইমরান আনসারী:
মালদ্বীপের নতুন মন্ত্রী পরিষদে ২৪ জনের মধ্যে ১১ জন পিএইচডি ডিগ্রীধারী। এপোষ্ট লেখার কারণে ভবিষ্যতে যারা এম.পি মন্ত্রী হতে চান তাদের কেউ কেউ উষ্মা প্রকাশ করেছেন। তাদের যুক্তি উচ্চশিক্ষিতরা পলিটিক্সে ফিট না। আসলেই কি তাই এই যে বাংলাদেশ স্বাধীন হল এর পেছনের ইতিহাসটা একটু বিশ্লেষণ করুণতো দেখি। এই যে পশ্চিম পাকিস্তান পূর্বপাকিস্তানের সাথে অর্থনৈতিক বৈষম্য করেছিল এটা কারা প্রথম জনগনের সামনে নিয়ে এসেছিল ? কম শিক্ষিত রাজনৈতিক নেতারা নাকি শিক্ষিত সমাজের নেতারা। অবশ্যই এটি সামনে এনেছিলেন ড. রেহমান সোবহানের মতো ব্যাক্তিবর্গ। যেটি পরে মুক্তিযুদ্ধের ক্ষেত্র তৈরী করেছিল। স্বাধীনতা উত্তরকালে বাংলাদেশে যে অর্থনৈতিক বুনিয়াদ তৈরী হয় তার ভিত্তিমূলে কাজ করেছিলেন কে ? তিনি মরহুম অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান। (তিনি দি ইনস্টিটিউট অভ চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অভ ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস (আইসিএইডাব্লিউ) থেকে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট (সিএ) ডিগ্রি অর্জন করেন) ।
পরবর্তীতে ভারতে মানমোহন সিং সাইফুর রহমান সাহেবের পলিসিকে গ্রহণ করে। স্বাধীনতা উত্তরকালে শিক্ষা ক্ষেত্রে অনন্য সাধারণ ভূমিকা পালন করে বিএনপি। বিশেষ করে নারী শিক্ষায় বৃত্তি প্রথা চালু, নকল প্রতিরোধ, শিক্ষক নিয়োগে নিবন্ধনের মতো উদ্যোগগুলো ছিল উল্লেখ করার মত। এর পেছনে যদি তাকাই কারা এর পেছনে ছিলেন? উত্তর প্রথমে ব্যারিষ্টার জমির উদ্দিন সরকার তার পর ড. উসমান ফারুক ও ড. এহসাানুল হক মিলন। তাদের প্রত্যেকে বিদেশ থেকে ডিগ্রী নেয়া। তাদের প্রত্যেকেই বেগম জিয়া ক্যাবিনেটে নিয়েছিলেন পয়সা দেখে নয়, শিক্ষা ও কাজ করবার দক্ষতা দেখে। বেগম জিয়া বিশ্বাস করতেন সুশিক্ষিত লোক দিয়েই মন্ত্রণালয় চালাতে হবে। তবে দুই মেয়াদে শিক্ষায় যে উন্নয়ন ঘটিয়েছেন তা কাঙ্খিত মানের বলা যায় না। তবে মন্দের ভাল। কারণ উচ্চ শিক্ষায় গবেষণা , মার্কেট অরিয়েন্টেন্ড কোর্স প্রবর্তন করতে পারেন নি তারা। এতক্ষণ শিক্ষিত নেতৃত্বের কিঞ্চিত গুনগান করলাম।
এশিক্ষার অবদমন শুরু হল নূরুল ইসলাম নাহিদকে শিক্ষামন্ত্রী করার মধ্য দিয়ে।
তখন অনেকে বলতে শুনতাম লোকটা সৎ । আরে ভাই এরকম সৎ লোক গ্রামে গঞ্জে অনেক পাওয়া যায় এবং যাবে। নুরুল ইসলাম নাহিদের শিক্ষার দৌর কতটুকু ছিল জাতি তা জানে। ওনার হাত ধরে শুরু হয়েছে দেশে প্রশ্নপত্র ফাঁস, পাঠ্যপুস্তকে ইসলাম বিদ্বেশী কারিকুলাম সংযোগ। তিনিই চালু করলেন কিভাবে জিপিএ ফাইভের বন্যা বসিয়ে দেয়া যায়। এখন জিপিএ ৫ প্রাপ্তদের জিজ্ঞেস করলে বলতে পারে না জিপিএ মানে কি , এস এস সি মানে কি? নুরুল ইসলাম নাহিদের হাত ধরে শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসে এবার পরিকল্পিতভাবে নেমেছেন ডা. দিপু মনি। দিপু মনির উদ্যোগটা পরিকল্পিত। এটি এজন্য মনে হচ্ছে – তার বিদেশ থেকে দু’টি ডিগ্রী নেয়া । তাঁর অন্তত ছেলেমি করার কথা না।
একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হয় ওই দেশের কালচার, রাজনৈতিক ইতিহাসের উপর ভিত্তি করে। আর এই ভিত্তির সাথে আপনাকে দুনিয়ার পরিবর্তনের ধারাকে একীভূত করতে হবে। দুনিয়ার পরিবর্তন এই ধারার নাম চতুর্থ শিল্পবিপ্লব। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এ যুগে আপনি বিছানা গোছানো, ব্যাঙের ডাক, সাইকেল চালানো, নাচানাচি , কুদাকুদি শেখাচ্ছেন। তুলে দিচ্ছেন পরীক্ষা পদ্ধতি। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের মানে এই নয় যে শিক্ষা হবে ইংরেজিতে। চীনের কত শতাংশ লোক ইংরেজিতে পড়ালেখা করে । জাপানের কত শতাংশ লোক ইংরেজিতে পড়ালেখা করে। ২ শতাংশের বেশি বলে মনে হয় না। তারা কি পিছিয়ে আছে জ্ঞান বিজ্ঞানে। একটি উদাহরণ দেই, যুক্তরাষ্ট্রের এমন কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট পাবেন না যেখানে একজন চাইনিজ শিক্ষক না আছে । তার মানে তারা খুব ভাল ইংরেজি জানে। উত্তর না। আমার চাইনিজ শিক্ষকদের ইংরেজি আমার বুঝতেই কষ্ট হয় । তাহলে তারা কিভাবে শিক্ষক হলেন । তারা তাদের চাইনিজ ভাষায় ম্যাথ, ইনফরমেশন সিসটেমের একেক জন পন্ডিত। থিউরি ডেভেলপমেন্ট ও প্রয়োগে সিদ্ধ হস্ত। এজন্য কম ইংরেজি জানা স্বত্বেও বিশ্ববিদ্যালয় তাদেরকে নিয়োগ দিয়েছে। দেশে বেশি ইংরেজি নির্ভর শিক্ষার অর্থই হচ্ছে শিক্ষা প্রাইভেট সেক্টরে চলে যাওয়া। আর পশ্চিমা সংস্কৃতির আমদানি করা। পশ্চিমা সংস্কৃতির আমদানির অর্থই হচ্ছে পরিবার প্রথা ভেঙ্গে যাওয়া। আর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে কম্পিউটার ও মোবাইল নির্ভর শিক্ষার অর্থই হচ্ছে – শিশুদের স্ক্রীন আসক্তি আর গেমসের মধ্যে নিক্ষেপ করা। আমার সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের সারসক্ষেপ হচ্ছে, এই জাতি বিধ্বংসী কারিকুলামকে এখনই থামাতে হবে । নতুন কারিকুলাম প্রণয়ণের আগে অভিভাবক , শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের নিয়ে পাবলিক হেয়ারিং করতে হবে।
মোহাম্মদ ইমরান আনসারী, প্রবাসী সাংবাদিক ।
এটা লেখকের ব্যক্তিগত মতামত। মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।