পরীমণিসহ ৫জনকে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ

চিত্রনায়িকা পরীমণি ও প্রযোজক নজরুল ইসলাম রাজসহ ৫ জনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। অপর তিনজন হলেন- আশরাফুল ইসলাম ওরফে দীপু মামা, ম্যানেজার সবুজ আলী ও মডেল মরিয়ম আক্তার মৌ। নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তাদের মুখোমুখি করেও জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে। মাদক কারবার, প্রতারণা ও পর্নোগ্রাফি সংক্রান্ত বিষয়ে জানার চেষ্টা করছে পুলিশ। রাজ ও সবুজের বিরুদ্ধে মাদক ও পর্নোগ্রাফি আইনে মামলা হয়েছে। অন্যদের বিরুদ্ধে হয়েছে মাদকের মামলা। সংশ্নিষ্ট সূত্র থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
এদিকে চলমান অভিযানের পর গ্রেপ্তারদের বিরুদ্ধে দায়ের আরও ৬টি মামলার তদন্তভার গতকাল সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়। সেগুলো হলো- বনানী থানায় রাজ ও সবুজের বিরুদ্ধে করা পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা, ভাটারা থানায় শরফুল হাসানের বিরুদ্ধে করা অস্ত্র আইনে মামলা, খিলক্ষেত থানায় পিয়াসা এবং মাহমুদুল হাসান জিসানের বিরুদ্ধে দায়ের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা, গুলশান থানায় হেলেনা জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে করা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা, ভাটারা থানায় মাহমুদুল হাসান জিসানের বিরুদ্ধে করা বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা ও একই থানায় মিশু হাসান এবং জিসানের নামে করা পর্নোগ্রাফি আইনে মামলা। এ নিয়ে মডেল-অভিনেত্রী ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে করা ১৫টি মামলার মধ্যে ১৪টিরই তদন্তের দায়িত্ব পেল সিআইডি।
মাদক মামলায় পরীমণি, মৌ ও দীপুর দ্বিতীয় দফায় ২ দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। রাজ ও সবুজ মাদক মামলায় ২ দিন এবং পর্নোগ্রাফির মামলায় চার দিনের পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন।
তদন্ত-সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, পরীমণি ও মৌ মাদক কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করছেন। তবে রাজ স্বীকার করেছেন, উঠতি অনেক মডেলকে তিনি ফাঁদে ফেলেছেন। এখন পর্যন্ত দুশর বেশি মডেল-অভিনেত্রীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছে। তার দাবি, গ্রাম থেকে ঢাকায় আসার পর পরীমণিকেও তিনিই আশ্রয় দেন। প্রথম তিন বছর পরীমণির খরচ বহন করেন তিনি।
জিজ্ঞাসাবাদে রাজ জানান, তার সংঘবদ্ধ একটি গ্রুপ রয়েছে। তাদের কাজ সোস্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে যারা টিকটক-লাইকিতে অভিনয় করেন সেখান থেকে সুন্দরীদের খুঁজে বের করা। এরপর তাদের কাছে নানা ধরনের প্রস্তাব নিয়ে যাওয়া হয়। কেউ ফাঁদে পা দিলে তখন উঠতি ওই মডেল ও অভিনেত্রীদের ছবি প্রভাবশালীদের কাছে পাঠান রাজ। এভাবে দীর্ঘদিন ধরে মডেল-অভিনেত্রীদের ব্যবহার করে আসছিলেন তিনি।
তদন্ত-সংশ্নিষ্ট সূত্র আরও জানায়, আপাতত কয়েকদিন অভিযান না হলেও মডেল-অভিনেত্রী ইস্যুতে বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির অতীত ও বর্তমান কিছু বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে ছায়া তদন্ত চলছে। এর মধ্যে একাধিক শিল্পপতি-ব্যবসায়ী, ব্যাংকের নীতিনির্ধারক, রাজনৈতিক ও বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন। একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার ভাষ্য, যে কোনো সময় প্রভাবশালীদের কেউ আইনের আওতায় আসতে পারেন। তবে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ ছাড়া কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হবে না।
সংশ্নিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, চলমান ইস্যুতে এখন পর্যন্ত কাউকে বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়নি। তবে প্রয়োজন হলে কারও কারও বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞাও আসতে পারে। তবে অভিজাত এলাকায় প্রতারণার চক্রে যারা দীর্ঘদিন জড়িত তাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
পিয়াসা-জিমি ও কবির কারাগারে :কথিত মডেল ফারিয়া মাহবুব পিয়াসা, চিত্রনায়িকা পরীমণির কস্টিউম ডিজাইনার জুনায়েদ করিম জিমি ও কবির হোসেনকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। ঢাকা মুখ্য মহানগর হাকিম বাকী বিল্লাহ গত বুধবার উভয়পক্ষের শুনানি শেষে তাদের রিমান্ড ও জামিন নাকচ করে এ আদেশ দেন। এর আগে গুলশান ও ভাটারা থানায় করা পৃথক ২টি মাদকের মামলায় রিমান্ড শেষে পিয়াসাকে আদালতে হাজির করে ফের ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করে সিআইডি। আদালত উভয়পক্ষের শুনানি শেষে রিমান্ড ও জামিন আবেদন নাকচ করেন।
গতকালই জুনায়েদ করিম জিমিকে আদালতে হাজির করে ফের ৫ দিনের রিমান্ড চায় সিআইডি। আদালত শুনানি শেষে রিমান্ড ও জামিন আবেদন নাকচ করেন। এ ছাড়া পরীমণির বিরুদ্ধে করা মামলার অপর আসামি কবির হোসেনের পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করে সিআইডি। আদালত তাঁকে রিমান্ড ও জামিন উভয় আবেদন নাকচ করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
১ আগস্ট রাতে পিয়াসার বারিধারার বাসায় অভিযান চালিয়ে মদ, ইয়াবাসহ তাকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। ৬ আগস্ট রাতে গুলশান থেকে জিমিকে আটক করা হয়। তার বিরুদ্ধে বনানী থানায় মাদক মামলা করা হয়। পরদিন আদালত তার তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
সাকলায়েন-পরীমণি আলোচনা :ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) গোলাম সাকলায়েন শিথিলের জন্মদিনে পরীমণির হাস্যোজ্জ্বল উপস্থিতি ও সেখানে দু’জনের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা। কীভাবে এই ভিডিও যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী এক সাংবাদিকের কাছে গেলে এ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে নানামুখী গুঞ্জন আছে। পরীমণির সঙ্গে সরকারি ফ্ল্যাটে ১৮ ঘণ্টা অবস্থানের তথ্য ফাঁস হলে সাকলায়েনকে ডিবি থেকে বদলি করা হয় পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্টে (সাবেক দাঙ্গা পুলিশ)। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটিও গঠন করে পুলিশ প্রশাসন।
গাড়ি কাহিনি :এখন পর্যন্ত মডেল, অভিনেত্রী ও তাদের সহযোগীদের কাছ থেকে সিআইডি যে ছয়টি গাড়ি জব্দ করেছে, সেগুলোর ব্যাপারে সমকালের পক্ষ থেকে খোঁজ নেওয়া হয়। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য বলছে, মাজদা এক্সেলা ব্র্যান্ডের নীল রঙের গাড়িটি (ঢাকা মেট্রো-গ-৩৪-৫০০৯) পিয়াসার নামে নিবন্ধিত। এ ছাড়া পিয়াসার হেফাজত থেকে জব্দ করা বিএমডব্লিউ (ঢাকা মেট্রো-গ-৩৯-৮৫৭৪) গাড়ির স্বত্বাধিকারী হিসেবে ‘দ্য রিলায়েবল বিল্ডার্স’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের নাম আছে। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে দেখা যায়, ওরিয়েন্ট ট্রেডিং অ্যান্ড বিল্ডার্স লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান দ্য রিলায়েবল বিল্ডার্স। এটির মালিক শফিকুল আলম মিথুন। পরীমণির কাছ থেকে জব্দ ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৫-৯৬৫৩ নম্বরের গাড়িটি একটি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কিনেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গাড়িটির মালিকের নামের স্থানে পরীমণির নাম রয়েছে। নজরুল ইসলাম রাজের বাসা থেকে জব্দ দুটি গাড়ির মধ্যে হ্যারিয়ারটির (ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৫-৬৪০১) মালিক তিনি নিজেই। আর জব্দ র্যাভ-৪ (ঢাকা মেট্রো-গ-১৩-৪৬১৭) গাড়ির মালিকের জায়গায় রাশিদুজ্জামান রাজুর নাম আছে। আর মিশুর কাছ থেকে যে গাড়িটি জব্দ করা হয়েছে, সেটির নম্বর প্লেট সঠিক নয়।-সমকাল