প্রধান মন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি

সুলতানা রহমান:
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
বঙ্গবন্ধুকে আমরা ভালবাসি, আপনাকেও আমরা ভালোবাসি- এই ভালবাসা দেশের জন্য, আদর্শের জন্য। আমাদের ভালবাসার পরিসরটি আরো বড়। আমরা ভালবাসি আমাদের পরিবার স্বজন বন্ধু সতীর্থদেরকেও। কিন্তু এই দুই ভালোবাসায় যখন সংঘাত তৈরী হয়, তখন অন্যায় অবিচারের বিপক্ষে আর সত্য ন্যায়ের পক্ষে গভীরতম ফাটল সৃষ্টি হয়। সেই ফাটল একদিনে যেমন বৃহৎ হয় না, তেমনি একদিনে অন্যায়কারী পক্ষকে প্রতিরোধে সম্মিলিত শক্তি সন্চিত হয়না। আজ আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। আমাদের বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে উঠেছে। প্রতিরোধ না করাটাই এখন চরমতম অন্যায়।
অনুসন্ধানী সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম আমাদের শুধুই ব্যক্তিগত স্বজন বন্ধু নয়, সাহসী রোজিনা ইসলাম বাংলাদেশের বন্ধু। আমরা তাকে ভালোবাসি, তাকে নিয়ে গর্ব করি। তার একেকটি রিপোর্ট অনিয়ম দুর্নীতির বিরুদ্ধে রিপোর্ট। দুনীর্তির বিরুদ্ধে আপনার জিরো টলারেন্স নীতি সত্য হলে সেই রোজিনা ইসলাম আপনার সবচেয়ে ভালো বন্ধু, সবচেয়ে বড় শুভাকাঙ্খি। কিন্তু না। আপনার প্রশাসন, আপনার আমলারা যেভাবে রোজিনা ইসলামকে হত্যার চেষ্টা করেছে, নির্যাতন চালিয়েছে, মামলা দিয়ে হাজতে পাঠিয়েছে তাতে স্পষ্ট রোজিনা ইসলাম আপনার বন্ধু নয়। অথবা প্রশাসনের উপর আপনার নিয়ন্ত্রন নেই। কারন যাই হোকনা- রোজিনার উপর আপনার প্রশাসনের এই অন্যায়ের দায় সবটুকু আপনার। এর কাফিয়ৎ আপনাকেই দিতে হবে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
সাগর রুনি হত্যার পর আপনি বলেছিলেন- বেড রুমের পাহারা দিতে পারবেননা! এরচেয়ে দায়িত্বহীনতার পরিচয় হয়না। আমরা বুঝেছিলাম আপনি কোথাও অসহায়। কিন্তু আপনার প্রশাসন আজ পর্যন্ত চান্চল্যকর এই হত্যা রহস্য উদঘাটন করতে পারলোনা। রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে এই ব্যর্থতার পুরো দায় আপনার।আজ সব অপরাধ অভিযোগের শুধুমাত্র আপনারই দিকে। কারন ভালোবাসে আপনাকে ছাড় দিতে দিতে আমাদের অস্তিত্বই এখন বিপন্ন। আজ সব অপরাধের সুদে আসলে হিসেব নেয়ার দিন এসে গেছে। কারণ রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে সব সব অন্যায় অপরাধের দায় আপনার।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
কিছু দুস্কৃতিকারী, দলে ঢুকে পরা বহিরাগত, সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী, সুবিধাভোগী, প্রশাসনে মেরে থাকা চক্র-নানা নামের উপর অভিযোগ করেছি। আপনার দিকে কেউ অভিযোগ তোলেনি। সব অন্যায় অপরাধের দায় থেকে আপনাকে মুক্ত রেখেছি। কারন আপনিই মায়ের মতো ভরসা, আপনিই এইদেশের বাতিঘর। উঁচু উঁচু অট্টালিকা, স্বপ্নের পদ্মাসেতু, নিম্নমধ্য আয়ের দেশ- আপনার এসব উন্নয়নে আমাদের গর্বিত মাথা আকাশ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। সেই মাথা লজ্জায় ঘৃনায় মাটির নিচে লুকিয়ে যায় যখন দেখি আপনার আমলা রোজিনা ইসলামের টুটি চেপে ধরে! পুলিশের ভ্যানে কারাবন্দী রোজিনা ইসলামের অসহায় চোখের দিকে তাকিয়ে আমরা হয়ে উঠি আরো বিপন্ন। আমাদের এই বিপন্নতার দায় আপনাকেই নিতে হবে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
রোজিনা ইসলামকে যখন ছয় ঘন্টা সচিবালয়ে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়- তখন আপনি কোথায় ছিলেন? আপনার কাছে খবর পৌছায়নি? তারোপরে, যখন সারারাত থানায় আটকে রাখা হয়- তখন? আরো পরে, কারাগারে পাঠানো, পুলিশের ৫দিনের রিমান্ড আবেদন, জামিন নামন্জুর- কোথায় ছিলেন আপনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী? যদি বলেন- আইন নিজস্ব গতিতে চলবে তাহলে তো রোজিনার জামিন হওয়ার সঙ্গত কারন ছিলো। এই সব প্রশ্নের উত্তর আপনার ভালোভাবেই জানা আছে। গণমাধ্যমের টুটি চেপে ধরার কত কৌশল আপনার আমলে দেখলাম। বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিয়ে, প্লটের লোভ দেখিয়ে, পদপদবির হাতছানি দিয়ে, ৫৭ ধারা আর অফিসিয়াল সিক্রেসি এ্যাক্ট দিয়ে- কত যে তরিকা।রোজিনা ইসলামের মতো এখনো দুচারজন সত্যানুসন্ধানী সাংবাদিক আছে যারা কারো কাছে মাথা বেঁচে দেয়না। সেই দুচারজনকেও স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছেন রোজিনা ইসলামের উপর নির্যাতন আর আইন দিয়ে!
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি তথ্য চুরি করেছেন। চুরি করা নিঃসন্দেহে অনৈতিক। আর অনৈতিক যে কোনো কিছুর সঙ্গে সাংবাদিকতার সংঘাত। কিন্তু অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় নৈতিকতার বিষয়টি কখনো কখনো একটি সূতার ব্যবধান মাত্র। চুরি করে তথ্য সংগ্রহ অনৈতিক। কিন্তু তথ্যটি যদি জনগনের স্বার্থের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়, যে তথ্য প্রকাশ না পেলে মানুষ কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে সেই তথ্য বিনা অনুমতিতে বা গোপনে বা চুরি করে হলেও সংগ্রহ করা ওই সাংবাদিকের নৈতিক দায়িত্ব হয়ে যায়। স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় যে বিবৃতি দিয়েছে তাতে রাশিয়ার সঙ্গে করোনার ভ্যাক্সিন সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে রোজিনা গোপনে নথির ফটো তুলেছে, নথি নিয়েছে। রোজিনার আগের রিপোর্ট থেকেই আমরা জানতে পেরেছি রাশিয়ার সঙ্গে ভ্যাক্সিন উৎপাদনের কথা বলে সরকার আসলে রাশিয়ার ভ্যাক্সিন মানুষকে দিতে চেয়েছে/ রাশিয়ার ভ্যাক্সিন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়নি। সেই ভ্যাক্সিন স্বাস্থ্যমন্ত্রনালয় গোপনে মানুষকে ট্রায়াল দিতে চেয়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তির শর্তগুলো রাষ্ট্র এবং জনগনের স্বার্থ বিরোধী। তাহলে এরচে জনগুরুত্বপূর্ণ আর কি হতে পারে? রোজিনা ইসলাম নৈতিক ভাবে পেশাগত দায়িত্ববোধ থেকে সঠিক কাজ করেছে। সেই রোজিনা ইসলাম কারাগারে পাঠিয়ে আপনি কাকে বাঁচাতে চাইলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী? আপনি আসলে নিজেকেই বাঁচাতে চাইলেন, কারন জনস্বার্থ বিরোধী শর্ত মেনে চুক্তির দায় সরকার প্রধান হিসেবে আপনাকেই নিতে হবে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আপনি নাকি গণমাধ্যম বান্ধব। সাংবাদিকদের খবর রাখেন? আপনি সম্ভবত আপনার তোষামোদকারী তথাকথিত সাংবাদিকদের খবর ভালো ভাবেই রাখেন। তাদেরকে প্লট দেন, মাসোহারা দেন, অনুদান দেন, প্রয়োজন অনুযায়ী পদ পদবি দিয়ে নেতা বানান। আমরা যারা এই পেশাকে ভালোবেসে সততার সঙ্গে নিরলস কাজ করি দেশের জন্য, সত্য সন্ধান করি, কখনো আপনার সাহায্য একখানা প্লট অনুদান কিংবা কোনো সুযোগসুবিধা তদবির না করে কেবলই পেশাগত দায়িত্ব পালন করি, নানা কৌশলে আপনি আপনার প্রশাসন, আপনার দলীয় গুন্ডা , প্রভাবশালীদের দিয়ে চাকরিচ্যুত করিয়েছেন। মাথা না বেচা ভালো সাংবাদিকদের চাকরি থাকেনা, কারণ তারা চাটুকারিতা করতে জানেনা। তারা সত্য সন্ধান করে। কোনো অফিস তাদের ভার আপনার ভয়ে ধারন করতে পারেনা। আজ দেশে সাংবাদিকতা নেই। এই পেশার অধপতনের সব দায় আপনার।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আপনি নিজের বিচার নিজে করবেন, সেই আশা আমরা করিনা। তবে বিচারপতির বিচার করতে জনতা কালে কালে সময় মতো জেগে ওঠে…এখনো সময় আছে! সাধু সাবধান।
আমেরিকা প্রবাসী সাংবাদিক সুলতানা রহমানের ফেসবুক থেকে নেয়া