Type to search

রাজনীতি

নেতাকর্মীদের বিপদে ফেলতে ফের হাসিনার উসকানি

দলের নেতাকর্মীদের বিপদে ফেলে ভারতে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফের একই খেলায় মেতেছেন। দলীয় কার্যালয় উদ্ধারের জন্য তিনি নেতাকর্মীদের সংঘবদ্ধ হয়ে মাঠে নামতে নির্দেশ দিচ্ছেন। এমনকি উসকানি দিয়ে বলেছেন, মাঠে নামার সময় এক গ্রুপ সামনে, আরেক গ্রুপ পেছনে থাকবা। সামনের গ্রুপ আক্রান্ত হলে পেছনের গ্রুপকে হামলা চালাতে হবে। কেউ হামলা করতে এলে তাদের চরম শিক্ষা দেওয়ার কথাও বলেছেন।

বুধবার যুগান্তরের হাতে আসা একটি ফোনালাপে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় যে কোনো মূল্যে উদ্ধারের জন্য এরকম নির্দেশ দেন শেখ হাসিনা। দিল্লিতে বসেই টেলিফোনে যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং ভোলা-৩ আসনের সাবেক সংসদ-সদস্য বিদেশে পলাতক নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনকে তিনি এ নির্দেশ দেন।

এদিকে এরকম নির্দেশনা নিয়ে খোদ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বিরক্ত এবং সংক্ষুব্ধ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন নেতা যুগান্তরকে বলেন, ‘সত্যি কথা বলতে কী, কেউ হয়তো এ মুহূর্তে ভয়ে বা অন্য কোনো কারণে প্রকাশ্যে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কথা বলবেন না। কিন্তু ৫ আগস্টের পর দলের অনেক নেতাকর্মী ওনার ওপর চরম ক্ষুব্ধ। কারণ, ওনার এবং ওনার আশপাশে থাকা কিছু হাইব্রিড আওয়ামী লীগারের ভুল ও লোভের কারণে আজ দলের এ চরম পরিণতি দেখা দিয়েছে।’

তারা বলেন, তিনি এবং তার পরিবারের সদস্যদের তো কিছুই হয়নি। তারা তো ভালোই আছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো-তিনি কীভাবে দেশের লাখ লাখ নেতাকর্মীকে বিপদের মধ্যে রেখে এভাবে পালিয়ে যেতে পারলেন। তাকে যারা ১৫ বছরে বিপথগামী করেছেন, দুহাতে লুটপাট ও দুর্নীতি করেছেন; তাদের অনেকে তার মতো বিদেশে পালিয়ে গেছেন। অথচ খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ নেতাকর্মীদের। ফলে তার মতো পলাতক নেত্রীর কথায় কেউ আর মাঠে নামবে না। বরং ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগ করব কি না এবং করলে কীভাবে, কাদের নেতৃত্বে কোন আাওয়ামী লীগ আমরা করব-সেটিই এখন প্রধান বিবেচ্য বিষয়।’

যুগান্তরের কাছে থাকা টেলিফোন বার্তায় নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনকে উদ্দেশ করে শেখ হাসিনাকে বলতে শোনা যায়, ‘এত বড় বড় কথা বলো, অথচ এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়টি উদ্ধার করতে পারলা না। ৫০ থেকে ১০০ জন লোকও যদি সেখানে যাও, তোমাদের কি মেরে কেটে শেষ করে দেবে। একদিকে লাখ লাখ লোক ঢাকায় আনার কথা বলো। আর ওদিকে একটা অফিস উদ্ধার করতে পার না। যা পারবা, তাই বলবা। প্র্যাকটিক্যাল কথা বলবা। যে কোনো মূল্যে কেন্দ্রীয় কার্যালয়টি উদ্ধার করতে হবে। এটাই আমার শেষ কথা।’

জবাবে নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন দলীয় সভাপতিকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আমরা কেন্দ্রীয় কার্যালয়টি উদ্ধারে পরিকল্পনা করেছিলাম। পরে নানা কারণে এই পরিকল্পনা বন্ধ করা হয়েছে। দলের কেউ কেউ বলেছে, এখন সময় না। সময় এলে তখন এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। তারপরও আপনি যখন বলছেন, আমি এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেব।’ এ সময় যুবলীগের পলাতক এই নেতা আরও বলেন, ‘আপনার নির্দেশে আশা করি শুধু ভোলা থেকেই ২০ লাখ মানুষ ঢাকায় সমবেত হবে। আপনার যখনই প্রয়োজন হবে, যখনই ডাক দেবেন; আপনার তাৎক্ষণিক ডাকে আমরা ভোলা থেকে তিন থেকে চার লাখ লোক ঢাকায় সমবেত হব।’ নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন আরও বলেন, ‘আমি আর কথা বাড়াব না। আপনার কথা সবাই শুনবে। সবাই অপেক্ষায় আছে। আপনাকে অনেক অনেক সালাম।’

টেলিফোনে শেখ হাসিনা এ সময় নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনকে আরও বেশকিছু নির্দেশনা দেন। ভোলার এই সাবেক সংসদ-সদস্যকে তিনি বলেন, ‘এরপর থেকে আর ছোট ছোট কিংবা বিক্ষিপ্তভাবে মিছিল করার দরকার নেই। যখনই নামবা, বড় আকারে মিছিল নিয়ে নামবা। বেশি লোকজন নিয়ে বড় মিছিল করবা। সামনে এক গ্রুপ থাকবে, পেছনে থাকবে আরেক গ্রুপ। কেউ হামলা করতে এলে পালটা হামলা চালিয়ে তাদেরকে চরম শিক্ষা দিতে হবে।’ শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘কেউ কাউকে খাওয়াইয়া দেবে না। নিজেরটা নিজেরই অর্জন করতে হবে।’

ক্ষমতাচ্যুত সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধেও নিজের ক্ষোভ ঝাড়েন। শেখ হাসিনা বলেন, ‘ড. ইউনূস সব জায়গায় মিথ্যা কথা বলে বেড়াচ্ছে। সারা দিন সে মিথ্যা কথা বলছে। তার সময়ে আওয়ামী লীগের যেসব নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে, যাদের বাড়িঘরে হামলা এবং ভাঙচুর চালানো হয়েছে, তাদের তালিকা তৈরি করো। যেখানে যেখানে বাড়িঘর ভাঙা হইছে, তাদের বাড়িঘরের ছবি তোল, তাদের বক্তব্য ভিডিও করো। তাদের পক্ষ থেকে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্টে মামলা করার উদ্যোগ নাও।’

জবাবে নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন বলেন, ‘কিছু কিছু কাজ আমরা ইতোমধ্যে করেছি। নিহতদের তালিকা তৈরি করেছি। যাদের বাড়িঘর ভাঙচুর করা হয়েছে, জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর কিছু কিছু ছবি তুলেছি। নির্যাতিতদের বক্তব্য ভিডিও করেছি। এ কাজটি অব্যাহত আছে।’ তখন শেখ হাসিনা বলেন, ‘কিছু কিছু না। সবার তালিকা তৈরি করতে হবে। নেতাকর্মীদের এখন থেকেই মাঠে নামতে হবে।’

এ প্রসঙ্গে গণতন্ত্র মঞ্চের অন্যতম শীর্ষ নেতা ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, শেখ হাসিনা এবং তার পরিবারসহ আওয়ামী লীগের বেশির ভাগ নেতা বিদেশে নিরাপদ আশ্রয়ে থেকে যেসব বাণী দিচ্ছেন, যা সত্যিই দুঃখজনক। শেখ হাসিনা এবং তার দলের নেতারা ভারতসহ বিভিন্ন দেশে সেফ হোমে আরাম আয়েশেই আছেন। তাদের হাতে টাকাপয়সারও অভাব নেই। নিজেদের সুখের জীবন নিশ্চিত করে বিদেশে থেকেই দেশে থাকা নেতাকর্মীদের নতুন করে উসকানি দিচ্ছেন। নেতাকর্মীরা যাতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ফের রাস্তায় নামেন, তাদের ক্ষমতায় ফিরে আসার পথ তৈরি করে দেন-এমন নির্দেশনা দিচ্ছেন। কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে, একজন দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি কিংবা একটি দুর্নীতিবাজ ও লুটেরা পরিবারের জন্য তারা কেন নিজেদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলবেন।

তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ যেভাবে রাজনীতিতে ফেরার চেষ্টা করছে, আমার মনে হয় না সেভাবে তাদের আর ফেরার সুযোগ আছে। চোরাগোপ্তা হামলা, ঝটিকা মিছিল-মিটিং করে রাজনীতিতে ফিরে আসা যাবে না। সাইফুল হক বলেন, সাড়ে ১৫ বছরের অপশাসন, দুর্নীতি, লুটপাট, দলীয়করণ, অর্থ পাচার, খুন-গুম-অপহরণ নিয়ে আওয়ামী লীগ এখনো অনুতপ্ত না। ক্ষমতা হারোনার পর প্রায় আট মাস পার হয়ে গেছে। এখনো আওয়ামী লীগের কারও মধ্যে কোনোরকম অনুশোচনা কিংবা অনুতাপ নেই। বরং তারা তাদের শাসনামলকেই নানাভাবে গ্লোরিফাই করার অপচেষ্টা করে যাচ্ছে, যা সত্যিই দুঃখজনক।

প্রসঙ্গত, ছাত্র-জনতার নজিরবিহীন গণ-অভ্যুত্থানের মুখে দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনামলের ইতি টেনে গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দিল্লিতে পালিয়ে যান। সেই থেকে এখন পর্যন্ত তিনি মন্ত্রী পদমর্যাদায় ভারত সরকারের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে আছেন। এরপর মাঝেমধ্যেই মোবাইল ফোনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। ফের রাজপথে নামতে, এমনকি বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিরুদ্ধে সক্রিয় হতে উসকানি দিচ্ছেন। টেলিফোনে শেখ হাসিনার এরকম একাধিক কথোপকথন বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাঝেমধ্যেই ভাইরাল হতে দেখা গেছে।

-যুগান্তর

Translate »