ইউক্রেনে ব্যর্থতায় চাপের মুখে প্রেসিডেন্ট পুতিন

ইউক্রেনে একের পর এক সামরিক ব্যর্থতার কারণে রাশিয়ার মধ্যেও প্রকাশ্যে সমালোচনা বাড়ছে। প্রেসিডেন্ট পুতিনের কর্তৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তো এমনিতেই চাপে আছেন তিনি। এবার দেশের মধ্যেও চাপের মুখে পড়েছেন পুতিন। মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএর প্রধান বলেছেন, ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান ব্যর্থ হয়েছে। কিয়েভের বাহিনী একের পর এক এলাকা পুনর্দখল করছে। এর জবাবে খারকিভে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় পুরো শহর বিদ্যুৎ-বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
ব্যাপক চাপে পুতিন
ইউক্রেনের প্রতি সংহতির কারণে নয়, বরং রাশিয়ার জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তার মারাত্মক ক্ষতির অভিযোগ তুলে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও সামরিক বাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সমালোচনা করছেন কিছু জনপ্রতিনিধি ও নেতা। কেউ কেউ পুতিনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করার কথাও বলছেন। ‘অকারণে’ রাশিয়ার সেনাবাহিনীকে দুর্বল করে এবং জেনেশুনে দেশকে কড়া নিষেধাজ্ঞার শিকার করে পুতিন দেশের নিরাপত্তা ও অর্থনীতির অপূরণীয় ক্ষতি করছেন বলে তারা মনে করছেন। এমনকি কট্টর জাতীয়তাবাদীরাও রবিবার ইউক্রেন যুদ্ধে জয় নিশ্চিত করতে অবিলম্বে রণকৌশল পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছেন।
ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক বিপর্যয়ের কড়া সমালোচনা করেছেন পুতিনের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত চেচেন নেতা রামজান কাদিরভ। টেলিগ্রাম অ্যাপে প্রকাশিত প্রায় ১১ মিনিটের অডিও বার্তায় তিনি বলেন, সামরিক বাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্তরা ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’-এ দ্রুত পরিবর্তন না করলে তিনি রুশ নেতৃত্বের কাছে গিয়ে বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরতে বাধ্য হবেন। উগ্র জাতীয়তাবাদী নেতা ও গোয়েন্দা সংস্থা এফএসবির সাবেক অফিসার ইগর গিরকিন বর্তমান ঘটনাবলির সঙ্গে ১৯০৫ সালে মুকদেন যুদ্ধের তুলনা করেছেন। উল্লেখ্য, জাপানের সঙ্গে সেই যুদ্ধে রাশিয়ার শোচনীয় পরাজয়ের পর বলশেভিক বিপ্লব ঘটেছিল। তিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগুর কড়া সমালোচনা করেন।
পুতিন ইউক্রেনে রুশ সেনাবাহিনীর ব্যর্থতা নিয়ে এখনো মুখ খোলেননি। রবিবার তিনি মস্কো শহরের প্রতিষ্ঠা দিবস উদ্যাপন উত্সব নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। মস্কোর মাহাত্ম্য তুলে ধরে তিনি খুবই সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। রাশিয়ার দুর্দিনে মস্কোর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উৎসব পালন নিয়েও সমালোচনা উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে পুতিন রুশ সৈন্যদের দুরবস্থা এবং রাশিয়ার বর্তমান সামরিক দুর্বলতা সম্পর্কে আদৌ যথেষ্ট সচেতন কি না, সে বিষয়েও অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করছেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সামরিক বাহিনীও নীরব থাকায় অনেক মহলে বিভ্রান্তি বাড়ছে। ইউক্রেনে রুশ বাহিনীর ব্যর্থতা ঢাকতে প্রথমে কিছু অজুহাত তুলে ধরলেও তারপর মুখে কুলুপ এঁটেছেন কর্মকর্তারা। ইউক্রেন যুদ্ধে বিরোধীদের দমন করা অপেক্ষাকৃত সহজ হলেও রাশিয়ার নিজস্ব উগ্র জাতীয়তাবাদী শিবিরের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া পুতিনের জন্য বেশ কঠিন কাজ হবে। পশ্চিমা বিশ্বের ঘনিষ্ঠ ও উদারপন্থি তকমা দিয়ে তাদের জব্দ করা সম্ভব নয়।
রাতারাতি সেনাবাহিনীকে চাঙ্গা করে তোলা খোদ ভ্লাদিমির পুতিনের পক্ষে সম্ভব নয়। আবার কিছু না করে হাত গুটিয়ে বসে থেকে একের পর এক পরাজয় মেনে নেওয়ার ঝুঁকিও কম নয়। সেক্ষেত্রে কর্তৃত্ব হারানোর আশঙ্কা বাড়তেই থাকবে। কোণঠাসা হয়ে পুতিনের মতো মানুষ এমন নাজুক পরিস্থিতিতে নিজের গদি বাঁচাতে কী করে বসতে পারেন, সে বিষয়ে জল্পনাকল্পনা চলছে। পরমাণু অস্ত্র প্রয়োগের হুমকি তিনি আগেই দিয়েছেন।
- রুশ সামরিক অভিযান ব্যর্থ : বার্নস
সিআইএর প্রধান উইলিয়াম বার্নস বলেছেন, ইউক্রেনে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের অভিযান ইতিমধ্যে ব্যর্থ হয়েছে। সম্প্রতি ওয়াশিংটনে এক সম্মেলনে সিআইএর পরিচালক উইলিয়াম বার্নস বলেন, ফেব্রুয়ারিতে পুতিন যখন হামলার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তিনি ইউক্রেনীয়দের সংকল্পকে অবমূল্যায়ন করেছিলেন। এখন কিয়েভের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থনের ব্যাপারেও একই ভুল করছেন তিনি। বার্নস বলেন, ‘এই মুহূর্তে পুতিনের প্রতিজ্ঞা হলো ইউক্রেনীয়, ইউরোপীয় ও আমেরিকানদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়া। আমি ও আমার সিআইএ সহকর্মীদের বিশ্বাস, পুতিনের এই সংকল্প ভুল। ঠিক যেমন গত ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনীয়রা হামলা প্রতিহত করতে পারবে না বলে তিনি ভুল ভেবেছিলেন।’
- ইউক্রেনের পুনর্দখল, রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
ইউক্রেনের সেনাবাহিনী ২৪ ঘণ্টায় উত্তর-পূর্ব দিকের আরো এলাকা পুনর্দখল করলেও রুশ বাহিনী রবিবার থেকে পালটা আঘাত হানছে এবং ইউক্রেনের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এতে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে খারকিভের একটি তাপবিদ্যুত্ কেন্দ্রে আগুন ধরে যায়। এতে খারকিভ ও দোনেত্স্ক অঞ্চলের লাখো মানুষ বিদ্যুৎবিভ্রাটের শিকার হয়। —ডয়চেভেলে ও বিবিসি
এবিসিবি/এমআই